সাব-রেজিস্ট্রার প্রদীপের এত সম্পদের উৎস কি
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, 8:40 PM
NL24 News
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, 8:40 PM
সাব-রেজিস্ট্রার প্রদীপের এত সম্পদের উৎস কি
#স্বৈরাচারে দোসর হয়েও রয়েছেন বহাল তবিয়তে
পর্ব-১
নুর আলম প্রিন্স: বাংলাদেশের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে দুর্নীতি এবং ঘুষ বাণিজ্যের ঘটনা দীর্ঘদিনের এবং অতিপ্রচলিত। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রারদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে শত শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জন, জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি এবং বদলি বাণিজ্যসহ দালাল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রনের বিষয় নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইন মন্ত্রণালয় ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে আইনমন্ত্রীর দেয়া ছাত্রলীগ কোঠায় নিয়োগপ্রাপ্তরা এখনো সাব রেষ্ট্রি অফিসগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিম্মি করেছে রেখেছেন। আওয়ামী সরকারের মদদপুষ্ট শীর্ষ দুর্নীতিবাজ এবং ফ্যাসিস্ট সরকারের সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্তদের মধ্যে অন্যতম কুড়িগ্রাম চর রাজিবপুরের সাব-রেজিস্ট্রার প্রদীপ কুমার বিশ্বাস। তথ্য সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রেতাত্মা ও দোসর হিসাবে পরিচিত সাব রেজিস্ট্রার প্রদীপ কুমার বিশ্বাস যার বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া উপজেলায়। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন নিবন্ধন অধিদপ্তরের অধীনে ২০১২ সালে বরগুনার বেতাগী তে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে জগদান করেন। তবে জানা যায়, তাঁর বাবা স্কুলের সামান্য একজন সহকারী শিক্ষক হওয়ায় টুংগীপাড়ার চিংগরি গ্রামে তিন কাঠা জমিতে একটি টিনের ঘর রেখে গেলেও মাত্র ১৪ বছরের চাকুরীজীবনে প্রদীপ কুমার হয়ে উঠেছেন তাঁর এলাকার সবথেকে ধনবান এবং দানবির হাতেম তায়ির রুপে। এদিকে সাব রেজিস্টার প্রদীপ কুমারের সম্পদের পরিমাণ নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন উঠেছে। সহকর্মী, আত্মীয়স্বজন ও সেবা গ্রহীতাদের অভিযোগ— প্রদীপ কুমারের সম্পত্তির তালিকা এতই দীর্ঘ যে তার কোনো শেষ নেই। রাজধানী ঢাকা, নিজ জেলা গোপালগঞ্জসহ ও অন্যান্য জেলায় তার নামে, স্ত্রীর নামে, শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের নামে পরিবারের সদস্যদের নামে, আত্মীয় স্বজনের নামে বেনামে বিপুল পরিমাণ জমি, বাড়ি, মন্দির, ফ্ল্যাটের তথ্য ঘুরছে আলোচনায়। অভিযোগ রয়েছে, যখন যে সাব রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্ব পালন করেছেন প্রতিদিন যে পরিমাণ ঘুষ লেনদেন হত তার একটি বড় অংশ প্রদীপ কুমারের ব্যক্তিগত নির্দেশে সংগ্রহ করা হয়। ঘুষের হার নির্ধারণ থেকে শুরু করে দালালদের মাধ্যমে সংগ্রহ পর্যন্ত—সব ক্ষেত্রেই তার সরাসরি নিয়ন্ত্রনে রাখতেন। নিবন্ধন অধিদপ্তরে গোপালগঞ্জের একাধিক কর্মকর্তার অবিশ্বাস্য দুর্নীতি ও দৌরাত্ম চলছে। এসব কর্মকর্তারা গত ১৭ বছরে গোটা আওয়ামী লীগ আমলে গোপালগঞ্জের কোটায় লোভনীয় পদে থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন। বর্তমানে তিনি পুনরায় লোভনীয় জায়গায় পদায়নের জন্যও জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছেন। এক সাব রেজিস্ট্রার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিসিএস নন-ক্যাডারের লোভনীয় চাকরিগুলোর মধ্যে সাব-রেজিস্ট্রার অন্যতম। এটি আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিবন্ধন অধিদপ্তরের একটি কার্যালয়। ভূমি হস্তান্তর দলিল নিবন্ধন করা সাব-রেজিস্ট্রারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। নিজ জেলায় দায়িত্ব পালন করলে স্থানীয় প্রভাব, আত্মীয়স্বজন ও চেনাজানার কারণে জমি রেজিস্ট্রেশন ও রাজস্ব আদায়ের কাজে পক্ষপাতিত্ব বা অনিয়মের ঝুঁকি থাকে। তাই এটি সাধারণত এড়িয়ে চলা হয়। তবে প্রদীপ কুমার নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই আওয়ামী রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার করেই চাকুরীজীবনে নিজ জেলাতেই একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়াও তিনি আরও বলেন, এ ধরনের স্বৈরাচারের দোসররা মন্ত্রণালয়ের কাজকর্মে স্থবিরতা ও বিশৃঙ্খলা এনে বর্তমান সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার এক অন্তর্ঘাতী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে। এ ষড়যন্ত্র রুখে না দেওয়া হলে তারা যে কোনো সময়ে নিবন্ধন অধিদপ্তরকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। অভিযোগ রয়েছে, প্রদীপ কুমার বিশ্বাস ইতিপূর্বে পূর্বে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে ধরনের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছিলেন। কয়েকটি সূত্রের দাবি, অতীতেও তার বিরুদ্ধে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি, অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং দুদকে জমা পড়েছিল। তবে সেসব অভিযোগের তদন্ত তিনি ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে স্থগিত করে রেখেছেন এবং বিভিন্ন ভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশ করে তাঁর পক্ষে দ্বায় মুক্তি নিয়েছেন । বিভিন্ন তথ্য সূত্রে জানা যায়, সাব-রেজিস্টার প্রদীপ কুমার বিশ্বাস নিজের নামে স্ত্রী লিপি বিশ্বাস, মাতা শান্তি লতা বিশ্বাস, বড় বোন রিক্তা বিশ্বাস, মেঝো বোন গীতা বিশ্বাস, ছোট বোন নন্দী বিশ্বাস, আপন শ্যালক জয়, শ্বশুর শাশুড়ি সহ বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের নামে টুংগীপাড়া উপজেলায় বিভিন্ন মৌজায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ ক্রয় করেছেন। তাঁর অবৈধ পথে অর্জিত অর্থে মৃত বাবার নামে নিজ উপজেলা সহ আশেপাশের কয়েকটি উপজেলায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে প্রায় ২০টি থেকে ২৫টি মন্দির নির্মাণ পুনঃ সংস্করণসহ বিভিন্ন আশ্রম নির্মাণ করে দিয়েছেন। প্রদীপ কুমারের পিতার নামে নির্মিত মন্দিরের তালিকায় রয়েছে চিংগুড়ি পশ্চিম পাড়া সার্বজনীন কালী মন্দির, চিংগুড়ি মধ্যপাড়া সার্বজনীন দূর্গা মন্দির, নিজ বাড়ির সামনে কালী মন্দির ও নিজের ডুপ্লেক্স বাড়ির ভিতরে আরও একটি মন্দির তৈরি করেছেন এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামের ডুমুরিয়া নিজ মামা বাড়িতে একটি আশ্রম নির্মাণ করেছেন।ডুমুরিয়া বাজারে সার্বজনীন দুর্গা মন্দির, বাবুপাড়া গ্রামে পাগলের মন্দির, ভৈরবনগর গ্রামে সার্বজনীন দূর্গা মন্দির,লেবুতলা গ্রামে সার্বজনীন দূর্গা মন্দির, মোলারহাট থানার ভান্ডারখোলা গ্রামে সমাজপতি গোলক মন্ডলের বাড়িতে একটি মন্দির সংস্কার করে দিয়েছেন কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয়ে। তাঁর বন্ধু দীপকের বাড়িতে রামপাল থানায় একটি মন্দির নির্মাণ করেছেন। সাব-রেজিস্ট্রার প্রদীপ কুমার বিশ্বাস, সন্তোষ মন্ডল ও চিত্ত মন্ডলের কাছ থেকে বাড়ি নির্মাণের জন্য বিশ শতাংশ জমি ক্রয় করেন নিজ নামে। টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ঘোনাপাড়া বাসস্টান্ডে স্ত্রী লিপি বিশ্বাসের নামে কোটি টাকার সম্পদ ক্রয় করেছেন। টুংগীপাড়া হাসপাতালের হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট রায় মন্ডল বিপ্লব ও তার বোনের কাছ থেকে ভৈরব নগর মৌজায় ২৬৯ শতাংশ জমি ক্রয় করেন তার আপন বড় মামা ক্ষীর মোহন মন্ডল এর নামে ১৯/১১/২০২৩ তারিখে যাহার দলিল নম্বর ২৮০৩। হেলথ এসিস্ট্যান্ট রায়মন্ডলের পিতা রমণী রঞ্জন মন্ডলের কাছ থেকে চিংগড়ী মৌজায় প্রায় ১০০ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন মেঝো বোন স্কুল শিক্ষিকা গীতা বিশ্বাসের নামে ৩০/০৮/২০১৬ সালে যাহার দলিল নাম্বার ১৫৩৬। চিংগুড়ি মৌজায় চিত্তরঞ্জন মন্ডলের কাছ থেকে ৯৭৮ নং দলিলে ০৭/০৬/২০১৬ তারিখে ১০০ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন বোন গীতা বিশ্বাসের নামে। সুব্রত মিস্ত্রির কাছ থেকে নিজ বাড়ির সামনে পাঁচ শতাংশ জমি ক্রয় করেন বোন গীতা বিশ্বাসের নামে ও স্থায়ীভাবে একটি পাকা মন্দির নির্মাণ করে দেন। যাহার দলিল নাম্বার ১৫৯১ এবং দলিল সম্পাদিত হয়েছে ০৬/০৯/১৮ তারিখে, অমূল্য কুমার চৌধুরীর কাছ থেকে আপন মা শান্তি লতা বিশ্বাসের নামে চিংগুড়ি মৌজায় ১৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেন ১৮/০৬/২০১৯ তারিখে যাহার দলিল নম্বর ১০৯১।খিরোধ চৌধুরীর নিকট থেকে মাতা শান্তি লতা বিশ্বাসের নামে চিংগুড়ি মৌজায় ৫২ শতাংশ জমি ক্রয় করেন ২৮/০১/২০২০ তারিখে যাহার দলিল নাম্বার ২৪২। স্বর্ণকার উত্তম সরকারের নিকট থেকে বাড়ি নির্মাণের জন্য ৩০ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। বিভিন্ন দাপ্তরিক অনিয়ম, দুর্নীতি, কোটি কোটি টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত অর্থ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে জানতে কুড়িগ্রাম চররাজিবপুরের সাব-রেজিস্ট্রার প্রদীপ কুমারের মুঠোফোনে কল দিলে তিনি তা অস্বীকার করেন । দৈনিক মুক্তখবরের অনুসন্ধানে সাব-রেজিস্ট্রার প্রদীপ কুমারের বিরুদ্ধে আরও ব্যাপক দাপ্তরিক দাপ্তরিক অনিয়ম, দুর্নীতি, বিভিন্ন সাব রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে ব্যাপক পরিমান সরকারি রাজস্ব ফাঁকি, সিন্ডিকেট এর মাধ্যমে দলিল নিবন্ধনের ধরন ও মূল্য অনুযায়ী অতিরিক্ত অর্থ আদায়, জমির শ্রেণী পরিবর্তনের তথ্য উপাত্ত উঠে এসেছে যা পরবর্তী সংখ্যায় প্রকাশ করা হবে।