সংকটেও ঘুরে দাঁড়ানোর আশা
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩১ আগস্ট, ২০২৬, 11:35 AM
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩১ আগস্ট, ২০২৬, 11:35 AM
সংকটেও ঘুরে দাঁড়ানোর আশা
দেশের আবাসন খাতে নানা কারণে মন্দার ছাপ পড়েছে। ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, নির্মাণসামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের উচ্চমূল্য ও এলসি জটিলতায় একদিকে কমেছে ফ্ল্যাট বিক্রি, অন্যদিকে বেড়েছে নির্মাণ ব্যয়। ফলে নতুন প্রকল্প হাতে নিতে পারছেন না অনেক উদ্যোক্তা; ধীরগতিতে চলছে চলমান প্রকল্পও। তবে এ অবস্থায়ও ঘুরে দাঁড়ানোর আশা দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আবাসন ও নির্মাণ উপকরণ খাতের জন্য বিশেষ নীতিসহায়তার পাশাপাশি ক্রেতাদের স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংকঋণের সুযোগ দিতে হবে।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) তথ্য মতে, পুরো শিল্প খাতে মাসিক ফ্ল্যাট বিক্রি আগে যেখানে এক হাজার অতিক্রম করত, এখন সেটি কমে ২৫০-৩০০টিতে নেমে এসেছে। যেখানে বছরে ৫ থেকে ৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যাশা ছিল, সেখানে উল্টো স্থবির হয়ে পড়েছে বাজার। কিছু প্রকল্পে ৫ থেকে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কমতে দেখা গেছে। এ ছাড়া বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বাজার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গুলশান, বনানী ও ধানমণ্ডিতে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের বিক্রি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আবাসন বা রিয়েল এস্টেট খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি স্তম্ভ। এ খাত সংকটে পড়লে পুরো অর্থনীতিই বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে। জিডিপিতে ১৮ শতাংশ অবদান রাখা এ খাত বর্তমানে নানা কারণে মন্দার সম্মুখীন। রড, সিমেন্ট, ইট, বালু ও পাথরের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে একটি ফ্ল্যাট বা ভবন নির্মাণের খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) কমে যাওয়ায় আগে যেখানে ৮-৯ তলা ভবন নির্মাণের সুযোগ ছিল, এখন সেটি ৫-৬ তলায় সীমিত। ফলে জমির মালিকরা তাঁদের জমি আবাসন কম্পানির কাছে হস্তান্তর করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
এ বিষয়ে রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘এখন পুরো খাতটাই চাপের মধ্যে আছে। বিক্রি নেমে এসেছে ২০ থেকে ২৫ শতাংশে। নতুন প্রকল্প গ্রহণও কমেছে। ফলে শুধু ডেভেলপার নয়, নির্মাণ উপকরণের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার ব্যবসায়ীও সংকটে। বিক্রি না থাকায় অনেকের পুঁজি শেষ হয়ে যাচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ব্যাংকঋণের সুদহার বেড়েছে, নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে; কিন্তু ক্রেতা কমে গেছে। এই পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হলে আবাসন ও নির্মাণ উপকরণ খাতের জন্য বিশেষ নীতিসহায়তা দরকার। এটি ব্যবসায়ীদের জন্য যেমন প্রয়োজন, একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।’
আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা জানান, আবাসন খাতের সঙ্গে ১৬৯টির বেশি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প জড়িত। এর মধ্যে রয়েছে রড, সিমেন্ট, সিরামিক, কাচ, রং, ইট, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, অ্যালুমিনিয়াম, কাঠ ও স্যানিটারি পণ্যের বাজার। আবাসন খাতের মন্দা সরাসরি এসব শিল্পেও প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে এলসি খোলার জটিলতা ও ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে কাঁচামাল আমদানিও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। তাঁদের মতে, শুধু আবাসন কম্পানিকে নয়, নির্মাণ উপকরণ ব্যবসায়ীদের জন্যও বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে কম সুদে ঋণ, কর ছাড় এবং সহজ অর্থায়নের সুযোগ দিলে খাতটি কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে। আমদানিও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। তাঁদের মতে, শুধু আবাসন কম্পানিকে নয়, নির্মাণ উপকরণ ব্যবসায়ীদের জন্যও বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে কম সুদে ঋণ, কর ছাড় এবং সহজ অর্থায়নের সুযোগ দিলে খাতটি কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
ইস্পাতশিল্পের সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, আবাসন খাতে স্থবিরতার প্রভাব পড়েছে ইস্পাতশিল্পেও। রডের উৎপাদন কমে এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। এভাবে চলতে থাকলে এই ইন্ডাস্ট্রিকে সচল রাখা যাবে না। চাহিদা না থাকায় উৎপাদন দুই-তৃতীয়াংশ কমাতে বাধ্য হয়েছে ব্যবসায়ীরা।
নগর বিশেষজ্ঞ আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘আবাসন খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এ খাত সচল থাকলে কর্মসংস্থান বাড়ে, শিল্পকারখানার উৎপাদন বাড়ে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পায়। পরিকল্পিত শহর গড়তে আবাসনশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কাজ করতে হবে। তাই মন্দা সময়ে খাতটিকে বাঁচাতে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নীতি সহায়তা ও স্বল্প সুদে ব্যাংকঋণের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন খাতও ঘুরে দাঁড়ানোর উদাহরণ রয়েছে। মহামন্দার ফলে ২০০৩ সালে ঋণের সুদহার ১ শতাংশে নেমেছিল। এতে বাড়ি বিক্রির হার তুঙ্গে উঠেছিল।
আবাসন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্মাণ উপকরণের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে বাজার তদারকি বাড়ানো এবং উৎপাদন ও আমদানিতে নীতিগত সুবিধা দেওয়াও জরুরি। তা না হলে আবাসন খাতের বর্তমান সংকট আরো গভীর হতে পারে। সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ