ঢাকা ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
মিয়ামি বিমানবন্দরে অ্যামাজনের কার্গো প্লেন বিধ্বস্ত, নিহত ৫ ঢাকায় পুলিশের অভিযানে গ্রেফতার ৫১৪ নেপালে ধ্বংসস্তূপ থেকে ‘বাঁচাও’ বলে চিৎকার, ১১ দিন পর জীবিত উদ্ধার বৃদ্ধা এপেক সম্মেলনে: বিশ্বের তিন পরাশক্তি প্রধানের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা ধর্মীয় উপাসনালয়ের কর্মীদের সম্মানী-ভাতা দিচ্ছে সরকার সৌদি প্রবাসীদের জন্য বাংলাদেশ দূতাবাসের জরুরি নির্দেশনা ত্রিভুজ প্রেমের জেরে জব্বার হত্যা, ২০ দিন পর ঘাতক মন্টু গ্রেফতার সারা দেশে দমকা হাওয়া-বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা পর্যটকদের পদচারণায় মুখর কানাডা নয়াদিল্লিতে ছয়তলা ভবন ধসে নিহত ৬, ধ্বংসস্তূপে আটকা বহু মানুষ

যুদ্ধের খরচ জোগাতে প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট বৈধ করার পরিকল্পনা ইউক্রেনের

#

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,  10:56 AM

news image

টার্গেট ২৫ মিলিয়ন ডলার

সেই অর্থ দিয়ে প্রায় ৩০ হাজার সামরিক ড্রোন কেনা সম্ভব বলে হিসাব দিয়েছেন আইনপ্রণেতা ইয়ারোস্লাভ ঝেলেজনিয়াক


রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে বিপুল অর্থ ব্যয়ের চাপ সামলাতে নতুন একটি খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের কথা ভাবছে ইউক্রেন। দেশটির প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট শিল্পকে বৈধ অর্থনীতির আওতায় এনে কর আদায়ের পরিকল্পনা করছেন আইনপ্রণেতারা। এতে বছরে প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রাজস্ব আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেই অর্থ দিয়ে প্রায় ৩০ হাজার সামরিক ড্রোন কেনা সম্ভব বলে হিসাব দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনপ্রণেতা ইয়ারোস্লাভ ঝেলেজনিয়াক।


ইউক্রেনে বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট তৈরি, সংরক্ষণ ও বিতরণ আইনত অপরাধ। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অনলাইনভিত্তিক এই শিল্প দেশটিতে বড় আকারে গড়ে উঠেছে।


বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে কর আদায়কে ঘিরে। কর কর্তৃপক্ষ এখন বিদেশি প্ল্যাটফর্ম থেকে আয় করা কনটেন্ট নির্মাতাদের কাছ থেকে কর চাইছে। কিন্তু আয় ঘোষণা করে কর দিতে গেলেই তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ কনটেন্ট তৈরির অভিযোগ ওঠার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।


ইউক্রেনের পার্লামেন্টের অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান ইয়ারোস্লাভ ঝেলেজনিয়াক বিষয়টিকে ‘দুঃখজনক এবং হাস্যকর’ পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।


তিনি বলেন, ‘এই নারীরা হয় কর দেন না এবং ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হন, অথবা কর দেন এবং প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত হন।’


এই আইনি জটিলতার অবসান ঘটাতেই প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্টকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঝেলেজনিয়াকের সহ-রচিত বিলটি গত জুলাইয়ে ইউক্রেনের পার্লামেন্টে প্রথম পাঠে অনুমোদন পেয়েছে। এখন দ্বিতীয় পাঠের অপেক্ষায় রয়েছে এটি।


কর দিতে গিয়েই মামলার ঝুঁকি


ইউক্রেনের প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট শিল্পের আকার বোঝা যায় একটি পরিসংখ্যান থেকেই। একটি প্লার্টফর্মের মূল প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রায় ৭ হাজার ৯০০ ইউক্রেনীয় নির্মাতা প্ল্যাটফর্মটি থেকে ১৩১ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেন।


এরপর দেশটির কর কর্তৃপক্ষ এসব আয় নিয়ে কাজ শুরু করে। অনেক নির্মাতাকে আয় ঘোষণা করে কর পরিশোধের জন্য নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু কর দেওয়ার পরই কেউ কেউ উল্টো ফৌজদারি অভিযোগের মুখে পড়েন।


এমন পরিস্থিতিতে অনেক নির্মাতাকে বিদেশে গিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ পরপর তাঁরা ফ্রান্স বা স্পেনের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে ভাড়া করা বাড়িতে যান। সেখানে একটি নির্দিষ্ট সাইটের জন্য প্রায় ১০ লাখ গ্রাহকের জন্য কনটেন্ট তৈরি করেন।


ইউক্রেনে থাকলে গ্রেপ্তারের ঝুঁকি থাকায় বিদেশে গিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তার মতো আরও অনেক নির্মাতা স্থায়ী বা সাময়িকভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলে গেছেন।


পুলিশের অভিযানের অভিযোগ


এক নির্মাতার দাবি, এক সকালে মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পুলিশ তার বাড়িতে অভিযান চালায়। তার ল্যাপটপ, হার্ডড্রাইভ ও প্রায় ২০ হাজার ডলার নগদ অর্থ জব্দ করা হয়।


তার ভাষ্য, পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে ওয়েবক্যাম মডেলদের তালিকা ও ঠিকানাও ছিল। পরে মামলা তুলে নেওয়ার বিনিময়ে ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। তবে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন দিভরনিকোভা।


অন্য এক নারীও একই ধরনের পুলিশি অভিযানের কথা জানিয়েছেন। আদালতে হাজির হওয়ার জন্য তাকে তলব করা হলেও ঘুষ দেওয়ার চাপের আশঙ্কায় তিনি সেখানে যাননি।


ইউক্রেনের জেনারেল প্রসিকিউটরের কার্যালয়ও দেশটির তিন অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের তদন্তের কথা জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি পুলিশ বিভাগ স্থানীয় স্টুডিওগুলোর কাছ থেকে মাসে ২০ হাজার ডলারের বেশি অর্থ আদায় করত।


যুদ্ধের মধ্যেও চলছে ব্যবসা


ইউক্রেনের ভেতরে থাকা কনটেন্ট নির্মাতাদের কেউ কেউ অবশ্য ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। পশ্চিমাঞ্চলীয় লভিভের কাছে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন একজন নির্মাতা। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দিলেও বাস্তবে এটি একটি ওয়েবক্যাম স্টুডিও।


সেখানে কয়েক ডজন মডেল মূলত মার্কিন গ্রাহকদের জন্য কনটেন্ট তৈরি করেন। কাজের সময় তাদের রাশিয়ার বিমান হামলার সতর্কবার্তার দিকেও নজর রাখতে হয়। সাইরেন বাজলে কাজ বন্ধ করে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়।


মোসিচুক জানান, তার মডেলরা মাসে প্রায় ২ হাজার থেকে ৭ হাজার ডলার আয় করেন। তিনি তাদের কর দেওয়ার ক্ষেত্রেও সহায়তা করেন। গত বছর পুলিশ সেখানে অভিযান চালালেও কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে তার দাবি।


তার মতে, শিল্পটিকে বৈধ করা হলে সরকারের কর আয় আরও বাড়তে পারে। তিনি আইনপ্রণেতাদের কাছে দেওয়া এক চিঠিতে দাবি করেছেন, বর্তমানে মাসে প্রায় ৫ হাজার ডলার কর দেন তিনি। খাতটি বৈধ হলে সেই অর্থ কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব।


যুদ্ধের জন্য করের অর্থ


আইনি স্বীকৃতির দাবিতে দিভরনিকোভাও সরাসরি প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ওয়েবসাইটে আবেদন করেন। সেখানে নিজেকে ‘সচেতন করদাতা’ উল্লেখ করে তিনি জানান, ইতোমধ্যে প্রায় ৪০ মিলিয়ন রিভনিয়া বা ৯ লাখ ডলারের কাছাকাছি কর দিয়েছেন।


তার যুক্তি, এই অর্থ ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা খাতে ব্যবহার করা যেত। তার আবেদনে এক সপ্তাহের মধ্যে ২৫ হাজারের বেশি স্বাক্ষর পড়ে। এরপর জেলেনস্কি জানান, প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট বৈধ করার প্রস্তাবটি পার্লামেন্টে বিবেচনা করা হবে।


ঝেলেজনিয়াকের হিসাব অনুযায়ী, শিল্পটিকে বৈধ অর্থনীতিতে এনে নিয়মিত কর আরোপ করা গেলে বছরে প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলার রাজস্ব পাওয়া যেতে পারে। ইউক্রেনের বিশাল প্রতিরক্ষা ব্যয়ের তুলনায় অর্থটি খুব বেশি না হলেও যুদ্ধের সময় দেশীয় রাজস্বের একটি অতিরিক্ত উৎস তৈরি হবে।


এই অর্থ দিয়ে প্রায় ৩০ হাজার সামরিক ড্রোন কেনা সম্ভব বলেও তার হিসাব।


আইনজীবী লেসিয়া মিখালেনকো, যিনি শতাধিক অনলিফ্যানস নির্মাতার প্রতিনিধিত্ব করেছেন, মনে করেন এই ধরনের মামলা পরিচালনা করা যুদ্ধের সময়ে সরকারি সম্পদের অপচয়।


তার ভাষায়, ‘এটি ভুক্তভোগীহীন একটি অপরাধ। এমন সময়ে, যখন দেশের প্রতিরক্ষায় মনোযোগ দেওয়া উচিত, তখন এটি আইনি ব্যবস্থার ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করছে।’


বিলটি এখন দ্বিতীয় পাঠের অপেক্ষায়। সেটি পাস হলে ইউক্রেনের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পাশাপাশি হাজার হাজার কনটেন্ট নির্মাতা আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আসতে পারেন। একই সঙ্গে পুলিশের হয়রানি ও ঘুষের অভিযোগ কমানো এবং সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর পথও তৈরি হতে পারে।


সূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, এনডিটিভি, ফার্স্টপোস্ট

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম