খাটের সঙ্গে শিকলে বেঁধে স্ত্রীকে নির্মম নির্যাতন, লাশ উদ্ধার
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, 11:26 AM
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, 11:26 AM
খাটের সঙ্গে শিকলে বেঁধে স্ত্রীকে নির্মম নির্যাতন, লাশ উদ্ধার
‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি’
রাজধানীর খিলক্ষেতে স্ত্রী মুক্তা ইসলাম মাওয়াকে (২৫) পায়ে শিকল পরিয়ে খাটের সঙ্গে বেঁধে বেল্ট দিয়ে নির্মমভাবে পেটানোর অভিযোগ উঠেছে স্বামী সোহেল শিকদারের (৩১) বিরুদ্ধে। নির্যাতনের সেই ভিডিও নিজেই ধারণ করে মুক্তার ভাইয়ের মোবাইলে পাঠান সোহেল। ভিডিও পাঠানোর সময় তিনি লিখেছিলেন, ‘তোমার বোনকে নিয়ে যাও।’ এর তিন দিন পর ওই বাসা থেকেই মুক্তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।
মুক্তার পরিবারের অভিযোগ, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্দেহ ও যৌতুকের দাবিতে কয়েক মাস ধরে তাঁকে নির্যাতন করছিলেন সোহেল। সর্বশেষ নির্যাতনের পর মুক্তাকে হত্যা করে তাঁর লাশ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) খিলক্ষেতের একটি বাড়ির তৃতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে মুক্তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে ৩০ আগস্ট তাঁকে বেল্ট দিয়ে পেটানোর ভিডিও এক স্বজনের মোবাইলে পাঠান সোহেল। ভিডিওটি প্রায় তিন মিনিটের দৈর্ঘ্যের ছিল।
ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তার পায়ে শিকল পরানো এবং তাঁকে খাটের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। সোহেল বেল্ট দিয়ে তাঁকে একের পর এক আঘাত করছেন। একপর্যায়ে মুক্তার শরীরে কালচে ও রক্তাক্ত জখমের দাগ দেখা যায়।
নির্যাতনের একপর্যায়ে মুক্তা বলেন, ‘আমি কিছু করিনি। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’ এরপরও তাঁকে মারধর করা হয়।
এ সময় পাশের কক্ষে ছিল মুক্তার দুই সন্তান সাফওয়ান (৫) ও তাসফিয়া (৪)। মায়ের ওপর নির্যাতনের সময় দুই শিশুর কান্নার শব্দও শোনা যায়। একপর্যায়ে মুক্তা স্বামীকে বলেন, ‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি।’ তবে এতেও সোহেলের নির্যাতন থামেনি বলে অভিযোগ পরিবারের।
নির্যাতনের ভিডিওটি পাওয়ার পর মুক্তার স্বজনরা তাঁকে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার খিলক্ষেতের ওই বাসায় গিয়ে তাঁরা মুক্তার ঝুলন্ত লাশ দেখতে পান। পরিবারের দাবি, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই লাশটি সিলিং ফ্যান থেকে নামানো হয়।
মুক্তার লাশ উদ্ধারের ঘটনায় গত শুক্রবার খিলক্ষেত থানায় মামলা করেন তাঁর ছোট ভাই তানভীর রহমান। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে সন্দেহে মুক্তার ওপর নির্যাতন করতেন সোহেল। পাশাপাশি যৌতুকের জন্যও চাপ দেওয়া হতো। সর্বশেষ ৩০ আগস্ট তাঁকে বেল্ট দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। এতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
নিহতের ছোট ভাই তানভীর রহমান বলেন, ‘কয়েক মাস আগে আমার কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিলেন সোহেল। সেই টাকা দিতে দেরি হওয়ায় আমার বোনকে মারধর করা হতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাকে হারিয়ে তাঁর দুই বাচ্চা সারা দিন কান্নাকাটি করছে। বারবার বলছে, বাবা মাকে মেরে ঝুলিয়ে রেখেছে। এই ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুক্তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। একই এলাকার সোহেল শিকদারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে খিলক্ষেতে স্বামীর সঙ্গে থাকতেন মুক্তা।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সোহেল প্রথমে খিলক্ষেত এলাকায় মুদি দোকান চালাতেন। পরে এমব্রয়ডারি ব্যবসায় যুক্ত হন। সেখানেও ভালো করতে না পারার পর স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর অশান্তি বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে শ্বশুরবাড়ির কাছে যৌতুক দাবি শুরু করেন তিনি।
মুক্তার পরিবারের অভিযোগ, কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন অজুহাতে তাঁকে মারধর ও নির্যাতন করা হচ্ছিল। সর্বশেষ ৩০ আগস্টের নির্যাতনের পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিন দিন পর তাঁর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।
এ বিষয়ে খিলক্ষেত থানার ওসি মুহাম্মাদ সোহরাব আল হোসাইন বলেন, মুক্তাকে পেটানোর যে ভিডিও পাওয়া গেছে, সেটি তাঁর মৃত্যুর তিন দিন আগের। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে এটি হত্যা, না আত্মহত্যা। এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সোহেল শিকদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।