ঢাকা ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
বাণিজ্যিক পেয়ারায় ভারী ধাতু শেখ হাসিনাসহ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আর আপিলের সুযোগ নেই : চিফ প্রসিকিউটর এসআই আলতাফ হত্যা: র‍্যাবের অভিযানে মূলহোতাসহ গ্রেপ্তার আরও ৪ রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারা, দুই মাসে আয় ৭ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার সিফাত আব্দুল্লাহর জামিন নামঞ্জুর আগস্টে সড়কে ঝরেছে ৪৮১ প্রাণ ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্রকে রক্ষার আহ্বান রাষ্ট্রপতির ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন রাষ্ট্রপতি উপজেলা নির্বাচনে পোস্টার-মিছিল নিষিদ্ধ, বিধিমালায় আরও যা আছে শ্রীলংকার কাছে শেষ ওভারে হারল বাংলাদেশ

বাণিজ্যিক পেয়ারায় ভারী ধাতু

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,  1:58 PM

news image

তুলনামূলক কম দাম, সহজলভ্য আর পুষ্টিসমৃদ্ধ ফল পেয়ারা। এই ফল উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। অথচ পেয়ারা নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য এসেছে নতুন এক গবেষণায়। রাজশাহী বিভাগের বাণিজ্যিক বাগান থেকে সংগ্রহ করা কিছু পেয়ারায় অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি আর্সেনিক, সিসা ও ক্যাডমিয়াম পাওয়া গেছে।  


বাণিজ্যিক বাগান থেকে সংগ্রহ করা পেয়ারার ৯০ শতাংশে ক্যাডমিয়ামের মাত্রা অনুমোদিত সীমার বেশি ছিল। ৭০ শতাংশ নমুনায় পাওয়া গেছে অনুমোদিত মাত্রার বেশি সিসা। আর ৩০ শতাংশ নমুনায় আর্সেনিকের মাত্রা ছিল অনুমোদিত সীমার ওপরে।


গবেষকরা বলছেন, রাসায়নিক সার, কীটনাশক, সেচের পানি নাকি মাটি– কোন উৎস থেকে পেয়ারায় আর্সেনিক, সিসা ও ক্যাডমিয়াম এসেছে, তা জানতে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। এসব ভারী ধাতুর উৎস চিহ্নিত করে সেখান থেকে দূষণ কমাতে পারলে ফসলের মধ্যে এর অনুপ্রবেশও কমানো সম্ভব হবে। গবেষণার ফলের ভিত্তিতে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া গেলে নিরাপদ পেয়ারা উৎপাদন নিশ্চিত করা যাবে।


এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পুষ্টি ও খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের প্রভাষক মো. সাখাওয়াত হোসেন। তাঁর সঙ্গে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির আরও ছয় গবেষক যুক্ত ছিলেন।


দেশের চার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা রাজশাহী বিভাগের আট জেলার ১০ এলাকায় বাড়ির বাগান ও বাণিজ্যিক বাগান থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করে এ গবেষণা করেন। গবেষণাটি গত আগস্টে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’-এ প্রকাশিত হয়েছে।


খাবারের মাধ্যমে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ভারী ধাতু দীর্ঘ সময় গ্রহণ করলে প্রাপ্তবয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি একটু বেশি। গবেষণায় প্রায় সব নমুনার ক্ষেত্রেই শিশুদের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত হয়েছে। 


গবেষকরা অবশ্য সতর্ক করে বলেছেন, এ গবেষণার ফল রাজশাহী বিভাগের ১০টি এলাকার নমুনার ওপর ভিত্তি করে পাওয়া। তাই দেশের সব বাণিজ্যিক বাগানের পেয়ারা একই মাত্রায় দূষিত– এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। তবে ফলের নিরাপত্তা নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা, নিয়মিত নজরদারি এবং কৃষি পর্যায়ে নিরাপদ চর্চা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।


আর্সেনিক, সিসা, ক্যাডমিয়াম ও তামা

গবেষণায় আর্সেনিক, সিসা, ক্যাডমিয়াম ও তামা– এই চার ভারী ধাতুর উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, চারটি ধাতুর ঘনত্বই বাড়ির বাগানের চেয়ে বাণিজ্যিক বাগানের পেয়ারায় বেশি।


বাণিজ্যিক বাগানের পেয়ারায় আর্সেনিকের সর্বোচ্চ ঘনত্ব পাওয়া গেছে প্রতি কেজিতে ৩ দশমিক ৮৪ মিলিগ্রাম। খাদ্য নিরাপত্তার অনুমোদিত সীমা অনুযায়ী, পেয়ারায় আর্সেনিকের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা প্রতি কেজিতে ১ মিলিগ্রাম। বাণিজ্যিক বাগানের ৩০ শতাংশ নমুনায় আর্সেনিকের মাত্রা এই সীমা ছাড়িয়েছে। তবে বাড়ির বাগানের ১০০ ভাগ নমুনায় আর্সেনিকের মাত্রা অনুমোদিত সীমার মধ্যে পাওয়া গেছে। 


সিসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ঘনত্ব পাওয়া গেছে প্রতি কেজিতে ২ দশমিক ০৫ মিলিগ্রাম। অনুমোদিত সীমা প্রতি কেজিতে দশমিক ১ মিলিগ্রাম। বাণিজ্যিক বাগানের প্রায় ৭০ শতাংশ নমুনায় সিসার মাত্রা এই সীমার ওপরে ছিল। বাড়ির বাগানের সব পেয়ারায় সিসার মাত্রা অনুমোদিত সীমার মধ্যে ছিল। 


ক্যাডমিয়ামের ক্ষেত্রে ফলাফল একটু বেশি উদ্বেগজনক। বাণিজ্যিক বাগানের ৯০ শতাংশ নমুনায় এর মাত্রা অনুমোদিত সীমার বেশি পাওয়া গেছে। সর্বোচ্চ মাত্রা পাওয়া গেছে প্রতি কেজিতে ১ দশমিক ৮৮ মিলিগ্রাম, যেখানে অনুমোদিত সীমা দশমিক শূন্য ৫ মিলিগ্রাম। বাড়ির বাগানের ২০ শতাংশ পেয়ারায় ক্যাডমিয়ামের মাত্রা অনুমোদিত সীমার বেশি ছিল।


তামার ক্ষেত্রেও বাণিজ্যিক পেয়ারায় বেশি মাত্রা পাওয়া গেছে। সর্বোচ্চ ঘনত্ব ছিল প্রতি কেজিতে ৯ দশমিক ০৪ মিলিগ্রাম। বাণিজ্যিক বাগানের প্রায় অর্ধেক নমুনায় তামার মাত্রা অনুমোদিত সীমা ৪ দশমিক ৫ মিলিগ্রামের ওপরে ছিল। বাড়ির বাগানের সব নমুনায় তামার মাত্রা অনুমোদিত সীমার মধ্যে ছিল।


শিশুদের ঝুঁকি কেন বেশি

গবেষণায় পেয়ারায় ভারী ধাতুর উপস্থিতির পাশাপাশি এসব পেয়ারা খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের শরীরে কী পরিমাণ ভারী ধাতু প্রবেশ করতে পারে এবং তাতে কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে, সেটিও দেখা হয়েছে।


গবেষকরা যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার নির্ধারিত পদ্ধতি ব্যবহার করে ঝুঁকি মূল্যায়ন করেছেন। এতে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের শরীরের ওজন, দৈনিক পেয়ারা খাওয়ার পরিমাণ এবং পেয়ারায় ভারী ধাতুর ঘনত্ব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।


গবেষণার ফল অনুযায়ী, শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায় সব নমুনাতেই সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্দেশ করেছে। গবেষকরা বলছেন, শিশুদের ওজন কম হওয়ায় একই পরিমাণ দূষিত খাবার গ্রহণ করলে দূষকের মাত্রা বেশি হয়। তাই ভারী ধাতুদূষিত খাবারের ক্ষেত্রে শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকে।


উৎস কোথায়, জানা যায়নি

পেয়ারায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেলেও এসব ধাতু ঠিক কোন উৎস থেকে এসেছে, তা এ গবেষণায় নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়নি। গবেষণাপত্রেও এই সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যে জমি থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করা হয়েছে, সেই জমির মাটি বা সেচের পানিতে ভারী ধাতুর মাত্রা গবেষকরা সরাসরি পরীক্ষা করেননি। 


গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটিতে ভারী ধাতু জমতে পারে। দূষিত ভূগর্ভস্থ বা উপরিভাগের পানি দিয়ে সেচ দেওয়ার মাধ্যমেও এসব ধাতু ফসলে প্রবেশ করতে পারে। শিল্পকারখানার নির্গমন ও যানবাহনের ধোঁয়া থেকেও বাতাসের মাধ্যমে মাটিতে ভারী ধাতু জমতে পারে।


২০২৫ সালে রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও জয়পুরহাট– এই আট জেলা থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করা হয়। বগুড়া ও সিরাজগঞ্জে দুটি করে এবং অন্য ছয় জেলায় একটি করে এলাকা থেকে নেওয়া হয় নমুনা। প্রতিটি এলাকায় পাশাপাশি একটি বাড়ির বাগান ও একটি বাণিজ্যিক বাগান নির্বাচন করা হয়। দুই ধরনের বাগানের দূরত্ব ছিল প্রায় এক কিলোমিটার। প্রতিটি নির্বাচিত গাছ থেকে পরিপক্ব তিনটি পেয়ারা সংগ্রহ করা হয়। পরে গবেষণাগারে এসব নমুনায় আর্সেনিক, সিসা, ক্যাডমিয়াম ও তামার মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। ভারী ধাতু শনাক্ত করতে প্লাজমাভিত্তিক আলোক নিঃসরণ বর্ণালিবীক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে খুব অল্প পরিমাণে থাকা ধাতুও নির্ণয় করা সম্ভব।


গবেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে খাওয়া হয় এমন ফলগুলোতে ভারী ধাতুদূষণ নিয়ে নিয়মিত নজরদারি থাকা দরকার। বিশেষ করে বাণিজ্যিক বাগানের ক্ষেত্রে মাটি, সেচের পানি, সার ও কীটনাশকের মান পরীক্ষা জরুরি।


আতঙ্ক নয়, নিরাপদ কৃষিচর্চার তাগিদ

গবেষণা দলের প্রধান মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আট মাস ধরে গবেষণাকাজ চলে। নমুনাগুলো যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষণার উদ্দেশ্য খাদ্যে ক্ষতিকর ভারী ধাতুর অনুপ্রবেশ কীভাবে কমানো যায়, সেটি নিশ্চিত করা। 


মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কৃষক পর্যায়ে বিষয়টি নজরদারির জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকরা কী ধরনের কীটনাশক কতটা ব্যবহার করছেন এবং সেগুলোর মান কেমন, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিমালা ও মাঠ পর্যায়ে তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন। সবচেয়ে জরুরি হলো ‘উত্তম কৃষিচর্চা’ অনুসরণ করা। অর্থাৎ সঠিক নিয়ম ও পরিমাণে কীটনাশক, সার ও সেচের পানি ব্যবহার করা। কৃষি মন্ত্রণালয় কৃষকদের ‘উত্তম কৃষিচর্চা’ অনুসরণে দেশজুড়ে কাজ করছে। এ উদ্যোগ আরও জোরদার করা গেলে খাদ্যপণ্যে ভারী ধাতুর দূষণ কমানো এবং নিরাপদ ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে। সূত্র : দৈনিক সমকাল 

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : মো. নজরুল ইসলাম