এআইয়ের হাত ধরেই তৈরি হচ্ছে ১০ লাখ নতুন চাকরি
আইটি ডেস্ক
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, 4:30 PM
আইটি ডেস্ক
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, 4:30 PM
এআইয়ের হাত ধরেই তৈরি হচ্ছে ১০ লাখ নতুন চাকরি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে—এমন আশঙ্কা দীর্ঘদিনের। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত চাকরি কমানোর চেয়ে নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতেই এআইয়ের প্রভাব বেশি।
দ্য ইকোনমিস্টের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রে এআইয়ের কারণে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে। বিপরীতে, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে এআইয়ের কারণে চাকরি হারিয়েছেন প্রায় দুই লাখ মানুষ। অর্থাৎ এআইয়ের কারণে হারানো চাকরির তুলনায় নতুন চাকরির সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি।
গত ৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএলএস) তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশটিতে ১ লাখ ৬২ হাজার নতুন চাকরি যোগ হয়েছে। বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ।
তরুণদের শ্রমবাজারেও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ধাক্কার প্রমাণ নেই। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের বেকারত্বের হার এবং সামগ্রিক বেকারত্বের হারের ব্যবধান কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম কম পর্যায়ে রয়েছে।
এআইয়ের বিস্তারের সবচেয়ে বড় সুফল দেখা যাচ্ছে অবকাঠামো খাতে। এআই পরিচালনায় বিপুলসংখ্যক চিপ, সার্ভার, ডেটা সেন্টার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো প্রয়োজন হচ্ছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাবে, ২০২২ সালের তুলনায় এআই পরিচালনার প্রয়োজনীয় অবকাঠামোতে বছরে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় হচ্ছে। শুধু ডেটা সেন্টার নির্মাণেই বছরে ৭৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হচ্ছে, যা এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।
ফলে এ খাতে প্রয়োজন হচ্ছে বিপুলসংখ্যক কর্মীর। ডেটা সেন্টারে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে ইলেকট্রিশিয়ান, সার্ভার অতিরিক্ত গরম হওয়া ঠেকাতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিশেষজ্ঞ এবং বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে সংযোগের জন্য প্রকৌশলী প্রয়োজন হচ্ছে। পাশাপাশি সার্ভার স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজেও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে।
দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডেটা সেন্টার নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত পাঁচটি প্রধান শিল্পে ২০২৩ সালের পর প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার অতিরিক্ত কর্মসংস্থান হয়েছে। অন্যান্য নির্মাণ ও উৎপাদন খাতের স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে এই অতিরিক্ত কর্মসংস্থান ব্যাখ্যা করা যায় না।
চাকরির ওয়েবসাইট ইনডিডের তথ্য অনুযায়ী, দুই বছরে ডেটা সেন্টার–সংক্রান্ত চাকরির বিজ্ঞপ্তি দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। লিংকডইনের হিসাবে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় পাঁচ লাখ ডেটা সেন্টার–সংক্রান্ত চাকরি তৈরি হয়েছে।
কর্মীর চাহিদা বাড়ায় এসব চাকরির বেতনও বাড়ছে। ইনডিডের হিসাবে, ডেটা সেন্টারে স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজের বিজ্ঞাপনে দেওয়া বেতন একই ধরনের অন্যান্য কাজের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্যেও বেতন বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। জুন পর্যন্ত এক বছরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম উৎপাদন খাতে ঘণ্টাপ্রতি গড় আয় বেড়েছে ১৩ শতাংশের বেশি। বৈদ্যুতিক ঠিকাদারি খাতে বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ।
অর্থাৎ এআই অবকাঠামোর বিস্তার শুধু নতুন চাকরি তৈরি করছে না, কিছু পেশায় কর্মীদের দর-কষাকষির ক্ষমতাও বাড়াচ্ছে।
এআইয়ের কারণে শুধু নির্মাণ, বিদ্যুৎ বা যন্ত্রপাতি খাতেই চাকরি বাড়ছে না। তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের পেশাজীবী চাকরিও। এআই মডেল তৈরির জন্য প্রকৌশলী, তথ্য লেবেল করার জন্য ডেটা অ্যানোটেটর এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী এআই প্রযুক্তি কাজে লাগাতে ‘ফরওয়ার্ড-ডিপ্লয়ড’ প্রকৌশলীর মতো পদ তৈরি হচ্ছে।
অনেক প্রতিষ্ঠানেই তৈরি হচ্ছে ‘হেড অব এআই’ পদ। লিংকডইনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ সময়ের তুলনায় হেড অব এআই, এআই প্রকৌশলী এবং ডিরেক্টর অব এআই পদে চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
বার্নিং গ্লাস ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্যাড লেভাননের গবেষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে পেশাজীবী চাকরির প্রায় ১ শতাংশ এখন এআই–সম্পর্কিত। সংখ্যার হিসাবে এটি প্রায় ১০ লাখ পদ। কম্পিউটার ও জীবনবিজ্ঞান–সম্পর্কিত পেশায় এআইনির্ভর চাকরির অংশ ৪ থেকে ৫ শতাংশ।
লিংকডইনের আলাদা বিশ্লেষণেও ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার নতুন এআই–নির্দিষ্ট চাকরি তৈরির তথ্য পাওয়া গেছে।
এআইয়ের আরেকটি প্রভাব হচ্ছে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। একজন আইনজীবী এআই ব্যবহার করে দ্রুত চুক্তির খসড়া তৈরি করতে পারেন। একজন আর্থিক বিশ্লেষক কয়েক মিনিটে বিপুলসংখ্যক নথি বিশ্লেষণ করতে পারেন।
এর ফলে কোনো কাজ করতে কম সময় লাগলেও সেবার খরচ কমতে পারে। খরচ কমলে সেই সেবার চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। তখন প্রতিষ্ঠানে সামগ্রিক কাজের পরিমাণও বাড়তে পারে।
এ কারণে এআইয়ের ঝুঁকিতে থাকা বলে বিবেচিত কিছু পেশাতেও কর্মসংস্থান বেড়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্যারালিগ্যালদের কর্মসংস্থান বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। একই সময়ে বাজার গবেষণা বিশ্লেষকদের চাকরি বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ। জাতীয়ভাবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে এআইয়ের প্রভাব পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। কিছু রুটিন কাজের পেশায় এরই মধ্যে কর্মসংস্থান কমছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রাহকসেবা কর্মীদের চাকরি কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। সচিব ও প্রশাসনিক সহকারীদের চাকরি কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ।
এসব কাজের বড় অংশই নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক। ফলে এআই এজেন্টের সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে এসব পেশা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। বিএলএসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অফিস ও প্রশাসনিক সহায়তা–সংক্রান্ত পেশায় প্রায় ৭ লাখ ৫২ হাজার চাকরি কমতে পারে।
এআই মানুষের চাকরি শেষ করে দেবে কি না, তার চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের তথ্য বলছে, এআই চাকরি ধ্বংসের পাশাপাশি বড় পরিসরে নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি করছে।
কম্পিউটার যুগের আগে অস্তিত্ব ছিল না—এমন কম্পিউটার–সম্পর্কিত পেশায় এখন যুক্তরাষ্ট্রে ৬০ লাখের বেশি মানুষ কাজ করেন। গিগ অর্থনীতি, ই–কমার্স ও কনটেন্ট তৈরির মতো নতুন শিল্পেও কাজ করছেন আরও প্রায় ৮০ লাখ মানুষ।
ভবিষ্যতে মানুষ হয়তো স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টের দল পরিচালনা করবেন, কেউ হয়তো এআই এজেন্টদের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসার কাজ করবেন। আজকের চোখে এসব ধারণা অদ্ভুত মনে হলেও এক-দুই দশক আগেও ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ পেশাটির এমন বিস্তার কল্পনা করা কঠিন ছিল।